কেন মাত্র একটি পাপের জন্য কুরআনে আল্লাহ যুদ্ধ ঘোষণা করেন?
বিসমিল্লাহ। পুরো কুরআনে কেবল একটি পাপ আছে যেখানে শুধু সতর্কই করেন না, আল্লাহ পাপীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। আর সেটা খুন, চুরি বা শিরকও না। এটা হলো রিবা (সুদ/ব্যাধি)। আল্লাহ বলেন: "কিন্তু যদি তোমরা তা না কর, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা জেনে রেখো" (কুরআন ২:২৭৯)। তাহলে কেন সুদকে এতো কঠোরভাবে দেখা হয়? এটা টাকার চেয়েও গভীর। কল্পনা করো, এক ভাই বিপদে পড়া প্রতিবেশীকে ধার দিচ্ছে- চাকরি হারিয়েছে, মেডিকেল বিল, ছোট্ট একটা ব্যবসা টিকে থাকার লড়াই করছে। সাহায্য না করে সে অতিরিক্ত দাবি করছে। "একটু বেশি দিও।" এই বেশি টাকাই রিবা। অনেকের কাছে এটা স্বাভাবিক মনে হয়, কিন্তু ইসলামে এটা সাধারণ লেনদেনের চেয়ে বড় কিছু। রিবা দুর্দশার ওপর চড়ে বেড়ে ওঠে। কাদের সাধারণত ধার লাগে? স্বামী কাজ হারানো বোনটি, হাসপাতালের খরচ জোগাড় করা বাবা-মা, টিকে থাকার চেষ্টা করা দোকানদার। সুদ সেই প্রয়োজনের সাথে আঁকড়ে ধরে। তার কিছু যায় আসে না যদি তারা বেশি দিতে পারে কিনা- এটা বাধ্য করেই আদায় করে। কোনো অস্ত্র নেই, মারামারি নেই, তবু ধীরে ধীরে ওদের যা কিছু আছে তা কেড়ে নেয়। ইসলাম ন্যায়বিচার আর মিলিত ঝুঁকির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। হালাল ব্যবসায় দুপক্ষই ঝুঁকি ভাগ করে: ব্যবসা সফল হলে দুজনেই লাভ পায়; ব্যর্থ হলে বিনিয়োগকারীও ক্ষতি বহন করে। এটাই ন্যায্যতা। সুদের ক্ষেত্রে, ধার দেওয়া লোক প্রায় কোনো ঝুঁকি নেয় না- লাভ হোক বা ক্ষতি, ধার নেওয়া লোককে শোধ করতেই হবে। একপক্ষ সব সময় জেতে, অন্যপক্ষ পুরো বোঝা বয়ে যায়। এই ভারসাম্যহীনতার বিরুদ্ধেই ইসলাম লড়াই করে। কী হবে যদি পুরো সমাজ সুদের ওপর চলে? তখন সম্পদ ছড়ায় না- জমা হতে থাকে। টাকা প্রবাহিত হয় সংগ্রাম করা পরিবার থেকে বড় বড় প্রতিষ্ঠানে, অভাবীদের থেকে ধনীদের কাছে। সময়ের সাথে সাথে এটা অসমানতাকে গভীর করে। ইসলাম চায় সম্পদ চলমান থাকুক, কেন্দ্রীভূত না হয়। লুকানো ক্ষতি শুধু টাকার বিষয় না। ঋণ নিয়ে আসে রাতের ঘুমহীনতা, অবিরাম দুশ্চিন্তা, ভাঙা সংসার, পরিবারগুলো এমন এক চক্রে আটকা পড়ে যা ক্রমাগত কষে চলে। ক্ষতি শুধু মানিব্যাগে না, হৃদয় আর আত্মাতেও গভীর আঘাত করে। কেউ কেউ বলে: "যদি সব জায়গায় সুদ বৈধ, তাহলে নিষিদ্ধ কেন?" কারণ ইসলাম শুধু আইনের মাপকাঠিতে না, ন্যায়বিচারের মাপকাঠিতে বিচার করে। একটা চুক্তি সম্পূর্ণ আইনসম্মত হতে পারে তবু দুর্বলকে শোষণ করতে পারে। কুরআন দেখে সিস্টেম সত্যিই ন্যায্য কিনা। আর লাভের কী হবে? ইসলাম ব্যবসাকে রিবা থেকে আলাদা করে। একজন ব্যবসায়ী মাল কিনে, ভ্রমণ করে, গুদামে রাখে, ক্ষতির ঝুঁকি নেয়। লাভ আসে পরিশ্রম, মূল্য যোগ করা আর মিলিত ঝুঁকি থেকে। সুদ টাকাকে টাকা জন্মাতে দেয় কোনো সত্যিকারের কাজ ছাড়া। এই জন্যই "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন আর সুদকে হারাম করেছেন" (কুরআন ২:২৭৫)। শক্ত সতর্কবার্তা শুধু সুদ আছে বলেই না। বরং এটা যে জীবনকে ঘিরে ফেললে এমন একটি সিস্টেম স্বাভাবিক হয়ে যায় যেখানে ধনী ঝুঁকিহীনভাবে আরও ধনী হয়, আর গরিব আরও গভীরে ডুবে যায়। ইসলামের দৃষ্টিতে, এটা সেই ন্যায়বিচার আর দয়ার তলাটা ভেঙে দেয় যার ওপর সমাজ দাঁড়ানোর কথা। তাহলে আসল প্রশ্ন বোধহয় "সুদ কি সাধারণ?" বা "আইনে অনুমোদিত কিনা?" তা না; বরং: কোনো কিছু কি এত স্বাভাবিক, সবাই যেটা মানে, এবং যেটা তবু আল্লাহর নির্দেশিত ন্যায়বিচারের বিরুদ্ধে যেতে পারে? এই চ্যালেঞ্জটাই কুরআন প্রত্যেক বিশ্বাসীর সামনে রাখে।